কফি সংস্কৃতিতে চলছে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম জেন জেডরা এখন আর ঐতিহ্যবাহী কফি শপের দিকে আগের মতো আকৃষ্ট হচ্ছে না। তারা ঝুঁকছে ম্যাচা-ভিত্তিক পানীয়র দিকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় কফি চেইন কস্টা কফি তরুণদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। কফির দাম বাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি আর ভোক্তাদের বদলে যাওয়া রুচির কারণে কস্টা চাপে পড়েছে। কোকা-কোলা মালিকানাধীন এই চেইনটি বিক্রির কথাও ভাবছে। সম্ভাব্য বিক্রিমূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ২ বিলিয়ন পাউন্ড, যা ২০১৯ সালে কেনা দামের অর্ধেকেরও কম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নতুন ব্র্যান্ড ব্ল্যাঙ্ক স্ট্রিট কফি তরুণদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। টিকটকে ভাইরাল হওয়া নানা ম্যাচা ড্রিঙ্ক, দোকানের সাজসজ্জা আর বিশেষ আয়োজনের কারণে তারা দ্রুত বিস্তার ঘটাচ্ছে। শুধু লন্ডনেই তাদের ৩৫টির বেশি শাখা খোলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় কফি চেইনগুলো এখন মাঝপথে আটকে গেছে। তারা না খুব সস্তা, না খুব প্রিমিয়াম। ফলে স্বাধীন ক্যাফে ও ছোট চেইনগুলো বাজার দখল করছে। ম্যাচার জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে- এতে ক্যাফেইনের মাত্রা তুলনামূলক কম, আবার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি। একইসঙ্গে রঙিন ও দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় এগুলো শেয়ার করতেও আগ্রহী।
ম্যাচার যাত্রা শুরু প্রায় ৮০০ বছর আগে। ধারণা করা হয়, ১২০০ সালের দিকে জেন বৌদ্ধ ভিক্ষু ‘এইসাই’ চীন থেকে পাউডার চা জাপানে নিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে এটি ‘চানোয়ু’ বা জাপানি চা অনুষ্ঠানের মূল উপাদান হয়ে ওঠে যেখানে ধ্যান, আতিথেয়তা এবং ‘ওয়াবি-সাবি’ অর্থাৎ সরলতার সৌন্দর্য উদযাপন করা হয়। ১৫০০ সালের দিকে চা গুরু ‘সেন নো রিকিউ’ এর প্রস্তুত প্রক্রিয়াকে আরও নিখুঁত ও সুষম করে তোলেন। আজও ম্যাচার প্রতিটি চুমুক জাপানের ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত করে রাখে পানকারীকে।
সবুজ রঙের জন্যই নয়, স্বাস্থ্যগুণের কারণেও ম্যাচার জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। সাধারণ গ্রিন টিতে চা-পাতা ভিজিয়ে রেখে ফেলে দেওয়া হয়, কিন্তু ম্যাচায় মিহি গুঁড়ো করা পুরো পাতা পান করা হয়। তাই প্রতিটি চুমুকেই মেলে বাড়তি উপকারিতা বিশেষ করে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। গবেষণা বলছে, এক কাপ ম্যাচায় থাকে সাধারণ গ্রিন টির তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ক্যাটেচিন যা ক্ষতিকর ‘ফ্রি র্যাডিক্যাল’ নিষ্ক্রিয় করে শরীরকে সুরক্ষা দেয়। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ‘খারাপ’ এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতেও সহায়ক বলে মনে করা হয়।
ম্যাচা শুধু স্বাস্থ্যকর নয়, এটি এক স্মার্ট এনার্জি বুস্টারও। এতে রয়েছে ক্যাফেইন, তবে আছে এল-থিয়ানিন নামের অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা মনোসংযোগ ও শান্ত ভাব জাগায়। ফলে কফির মতো হঠাৎ চনমনে হয়ে আবার ক্লান্তি নেমে আসে না বরং সারা দিন মেলে স্থির ও মসৃণ শক্তি। এ ছাড়া ম্যাচা বিপাকক্রিয়া বাড়াতে ও শরীর থেকে টক্সিন দূর করতেও সাহায্য করে। এর ক্লোরোফিল লিভারের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ রাখে। তাই অনেকেই বলেন, এক কাপ ম্যাচা যেন দিনের শুরুতে এক টুকরো প্রাণশক্তি ও সতেজতার প্রতিশ্রুতি।
গাঢ় সবুজ রং আর ফেনাযুক্ত টেক্সচারের জন্য ম্যাচা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রিয় তারকা। শুধু ইনস্টাগ্রামেই #matcha হ্যাশট্যাগে মিলিয়ন মিলিয়ন পোস্ট। স্টাইলিশ লাটে বা উজ্জ্বল স্মুদি বোল সব জায়গায়ই ম্যাচার উপস্থিতি এখন চোখে পড়ার মতো। ট্রেন্ডি ক্যাফেগুলোতে এখন আলাদা ম্যাচা মেনু। লেয়ারড লাটে, রঙিন ফ্রাপে, আইসড ড্রিঙ্ক সবই যেন ক্যামেরাবন্দি হওয়ার অপেক্ষায়। মৌসুমি ফ্লেভার যেমন স্ট্রবেরি ম্যাচা বা ভ্যানিলা ম্যাচা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। এমনকি বড় আন্তর্জাতিক চেইনগুলোও এখন ম্যাচা যোগ করেছে তাদের মেনুতে। ক্রেজ শুধু পানীয়তে সীমাবদ্ধ নয়; ম্যাচা কুকিজ, কেক, আইসক্রিম, প্যানকেক সবই এখন জনপ্রিয় তালিকায়।